শুক্রবার, ৬ মার্চ, ২০২০

শহরের ছোট্ট বালক

কী যে নাম তার শহরের ছোট্ট বালক
যার খসে গেছে সব ক’টি ধূলির পালক
মায়ের তালাকের পর বাবা মরেছে খালে
গলির ধুরন্ধ এক মোড়লের মহা কূটচালে।
আরও কত না লতিজা তাহার কপালে
হাল হীন নৌকো সব ঢেউ তার পালে।
পালকহীন সে পাখি গায় না আগের মতো
শুকিয়ে শীর্ণতাপ্রাপ্ত স্রোতহারা নদীর মতো।
ভালোমন্দ তার কষ্টদ্বন্দ্ব বাড়ে গভীর রাতে
ঘুমোয় প্রতিবেশী ছালছাড়া কুকুরটির সাথে।
ভাতও খায় সে একই বিবর্ণ টিনের থালাতে
কখনও বৃথা ভাসে স্বপ্নে চাঁদা তারাদের সাথে।


আগুন,পরম প্রিয়সী আমার


‘‘আগুন, আগুনরে তোর অন্তর কেমন জানি
 তোর বুকে ঝাঁপ দিলে জ্বালা কমবে নি?’’

আগুন, পরম প্রিয়সী আমার, ভেবো না তোমায় ভুলে থাকি
তুমি যে আমার হাতের কব্জিতে লাল সুতোয় বাঁধা রাখি।
হরদম জ্বলছ চোখের সামনে, মেঘের গর্জনে আর বজ্রপাতে
জ্বলেই চলছ স্বামীহারা মিনু, নূরীর বুকের হাহাকারে, লজ্জাতে। 
তুমিই যে ঘৃতশিখা 
দুই সতীনের ঘরে চন্দনের লাকড়ি জুড়ে
তুমিই যে কষ্টলিখা 
সৎমায়ের নিপীড়নে অতীষ্ঠ ছোট্ট জোনাকির অন্তুপুরে। 
তুমি তো বোঝো না, কতটা ঘোরলাগা চোখে তাকিয়ে থাকি তোমার দিকে
তুমি তো খোঁজ না, ভয়ে জড়োসড়ো পার্সিয়ান সাকি এ প্রেমিকটিকে
প্রতিদিন, প্রতিমুহূর্তের আলোতে তোমার কী অনন্য মিষ্টি রূপ 
দিলে একেবারে উজার করেই দাও
নিলে একেবারে অবশিষ্ট না রেখে নাও।
পতঙ্গ হলেই চোখ বুজে ঝাঁপ দিতাম, একেবারে চুপ। 
ফুঁজিয়ামোতে 
যা সবচেয়ে বেশি বিকশিত, তা তোমার রূপ মদিরা গন্ধ
আমাকে আহ্বান জানায় লিখে যেতে চিরকাল কবিতার ছন্দ।
পুড়ে গিয়ে ফুরিয়ে যাবার আগেই খুব ইচ্ছে করে
স্বাদ নিই গলন্ত লাভার, এমন অপরূপ স্বরূপ তোমার। 
বালির সমূদ্র তীরে মাউন্ট আগুং থেকে ওইতো উদগীরণ হচ্ছে
অপরূপা অগ্নিতরল, এমন মহান সৌন্দর্যের পীড়ায় পুলকে
কাঁপছি ৪৫২০ কিলোমিটার দূর থেকেও।
আমার সনাতনী বন্ধুরা, তোমায় পায় মৃত্যুর পরই
পরম পুজনীয় আশ্রয়রূপে 

পুরান্নগর / ১০-১২-১৯


পথের ডাকের কোলাজ


পথের ডাকটি শুনতে কি পাও?
ডান-বামে দূরে কিংবা নিকটে
কত পথ ডাকে বিজনে ভজনে
আঁধার যখন গাঢ়তর হয়।

জীবনের পাশে নদী, পূবে বিল
মাঝখানে মরা খাল দগ্ধ মাঠ
আমরা ওখানে পাতি রাঙা খাট
উলুধ্বনি উঠে নীলাভ সুন্দর।

পথ-মত-অন্ধকার শঙ্খ নদী
সেতুবন্ধু পাতি গেরামের সঙ্গে
রাখালের গানে লালনের সুর
অন্দরে অন্তর গাঁথি পূর্ব বঙ্গে।

হাফজ-হাল্লাজ কিংবা বুল্লাকে’
মানি, হাজার তারার মধ্যমনি 
তুমিও এমন হও দাতা-ত্রাতা
জীবন হোক গলানো সোনার খনি।   



বৃহস্পতিবার, ৯ জানুয়ারী, ২০২০

জাতির জনক এবং বাংলাদেশের প্রথম রাষ্ট্রপতি শেখ মুজিুবর রহমান ও স্যার ডেবিড ফ্রস্ট সাক্ষাৎকার

(সম্পূর্ণ সাক্ষাৎকার)

অনুবাদ: গাজী সাফুল সলাম

সূচনা : এখানে এই চক্রপদীতে (Chakrapadi), আপনারা সম্ভবত দেখতে পাচ্ছেন, নতুন জন্ম নেয়া রাষ্ট্র বাংলাদেশের জনগণের ভালোবাসার নেতা শেখ মুজিবুর রহমান স্বদেশে ফিরেছেন স্বাভাবিক কিংবা যতটুকু স্বাভাবিক থাকা সম্ভব ছিল। বিবেচনায় নিতে পারেন গত কয়েক মাসের ঘটনাসমূহ। ঘটনাসমূহ ছিল এরকম : এই বাড়িগুলোতে কী ঘটেছিল। চারদিক থেকে ট্যাঙ্ক ও সাজুয়া গাড়ি নিয়ে এসে পশ্চিম পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর লোকেরা এলাকাটি ঘিরে ফেলেছিল। সহজ কথায় বলা চলে, তারা ভয়ানক আতঙ্ককর একটি পরিস্থিতির সৃষ্টি করেছিল এবং এরপর একনাগারে গুলি চালিয়েছিল শক্ত প্রতিরোধ শক্তিসম্পন্ন এলাকাটির ওপর। ফলাফল আমার চারপাশে দেখতে পাচ্ছেন, এলাকাটির প্রতিরোধ ক্ষমতা স্থিমিত হয়ে এসেছিলÑহালকা মেশিনগানের এলোপাথারি গুলিবর্ষণে। এমন আতঙ্ককর পরিস্থিতিতে সৈনিকরা প্রতিটি বাড়িতে প্রবেশ করেছিল বেঁচে থাকা লোকদের ধরে ছাদে উঠিয়ে বেয়োনেট দিয়ে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে হত্যা করেছিল। অনেককেই ছুঁড়ে ফেলে দিয়েছিল পেছনের রাস্তায়। ধারণা করা হয়, ওই এক চক্রপদিতেই ওইদিন ১০,০০০ লোক নিহত হয়েছিল। এখন একটি নতুন জাতির জন্ম হয়েছে, এবং শেখ মুজিবুর রহমান আপনি আজ এই জাতিটির প্রিয় নেতা, প্রথমবারের মতো টেলিভিশনে কথা বলছেন। এই হলো গত কয়েক মাসের রক্তক্ষরণের গল্পÑযার ফলোশ্র“তিতে বাংলাদেশের জন্ম হয়েছে। জয় বাংলা!
শেখ মুজিবুর রহমান
 ডেবিড ফ্রস্ট

ওই রাতে আপনি বন্দি হলেন, ওই রাতে প্রকৃতপক্ষে পশ্চিম পাকিস্তান বাহিনী একদিকে আক্রমণ করতে প্রস্তুত অন্যদিকে আপনার সঙ্গে কথা বলছিল সম্ভবত আপনার জন্য বিরক্তিকর কোনো বিষয়ে। এরপরই তারা হামলা করল, রাত ৮টা তখন বাজে, আপনি বাড়িতেই ছিলেন এবং গ্রেফতার হলেন। এর আগে আপনাকে সতর্ক করা হয়েছিল, আমি বিশ্বাস করি আর্মিরা পথে নেমেই ফোনটা করেছিল। আপনি কেন বাসায় থাকার সিদ্ধান্ত নিলেন এবং গ্রেফতার হতে চাইলেন?
শেখ মুজিব : দেখুন, এ বিষয়ে খুবই দারুণ একটি গল্প আছে। ওই সন্ধ্যায়, আমার বাড়ি ঘিরে রেখেছিল কমান্ডো বাহিনী। তারা আমাকে হত্যা করার জন্য ওৎপেতে ছিল। তারা পরিকল্পনা করেছিল ঘরের বাইরে আসলেই গুলি চালাবে আর প্রচার করবে যে, মুজিবুর রহমান নিহত হয়েছেন বাংলাদেশেরই চরমপন্থী কিছু লোকের হাতে। এরপর তারা সিদ্ধান্ত নিল বিশ্বকে বলার জন্য যে, আমরা মুজিবুর রহমানের সঙ্গে ঐক্যমত্যে পৌঁছোনোর চেষ্টা করেছিলাম কিন্তু চরমপন্থীরা তাকে হত্যা করেছে। পরিস্থিতির মোকাবেলার জন্য এর বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নেওয়া ছাড়া ইয়াহিয়া খানের বিকল্প উপায় ছিল না। ওটাই ছিল তাদের প্রাথমিক মনোবাঞ্ছা। আমি জানতাম তারা বর্বর, অসভ্য। তারা আমার সব লোকদের হত্যা করবে। একটি নৃসংশ হত্যকাণ্ড  তারা চালাবে। আমি সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম,  মরে হলেও আমি আমার লোকদের বাঁচাব। তারা যে আমায় প্রচণ্ড  ভালোবাসে।
ডেভিড ফ্রস্ট : আপনি সম্ভবত ইচ্ছে করলে কলকাতা চলে পারতেন।
শেখ মুজিবুর রহমান : আমি যে কোনো জায়গায় চলে যেতে পারতাম-যদি আমি ইচ্ছে করতাম। কিন্তু কীভাবে আমি আমার মানুষদের ছেড়ে যেতে পারি? আমি জাতির নেতা। আমি যুদ্ধ করতে পারি, মরতে পারি কিন্তু আমার লোকদের বলতে পারি নিজেদের সামলে  রেখো।
ফ্রস্ট : অবশ্যই আপনি সঠিক সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। কারণ গত নয় মাস লোকেরা আপনার প্রতি তাদের বিশ্বাসের প্রমাণ দিয়েছে। তারা আপনাকে এখন প্রায় ঈশ্বর মনে করে।
শেখ মুজিব : আমি এ কথা বলি না, আমি বলি যে তারা আমাকে ভালোবাসে। আমিও তাদের ভালোবাসি এবং তাদের জীবন আমি রক্ষা করতে চাই। কিন্তু ওই হারামিরা আমাকে গ্রেফতার করেছে, তারা আমার বাড়ি ভেঙে দিয়েছে, আমার গ্রামের বাড়িতে আগুন দিয়েছে। ওখানে আমার বৃদ্ধ পিতা-মাতা থাকতেন। আমার বাবার বয়স ৯০ বছর, মায়ের বয়স ৮০ বছর। তারা আমার গ্রামের বাড়িতে বসবাস করছিলেন। শেখ মুজিবাধিকার সূত্রে পাওয়া গ্রামের অভ্যন্তরে আমার বাড়ি। তারা সেখানে মিলিটারি পাঠিয়েছে। আমার পিতামাতাকে ঘর থেকে বের করে তাদের সামনেই তাতে আগুন দিয়েছে। সুতরাং তারা এখন আশ্রয়হীন। এভাবেই তারা সবকিছু জ্বালিয়ে দিয়েছে। আমি ভেবেছিলাম, আমাকে পেলে তারা অন্ততপক্ষে আমার সাধারণ দুর্ভাগা মানুষদের হত্যা করবে না। কিন্তু আমি এটা জানি, আমার দল যথেষ্ট শক্তিশালী। আমি যে দলটি গড়ে তুলেছি এবং এর পেছনে যারা আছে তারা শেষ পর্যন্ত লড়াই করবে। আমি তাদের বলেছিলাম, প্রতিটি বিন্দুর জন্য তোমরা লড়ো। আমি তাদের বলেছিলাম, এটাই আমার শেষ নির্দেশ, যতদিন না শৃঙ্খল মুক্ত না হবে, যুদ্ধ চালিয়ে যাবে।
 ফ্রস্ট : কী প্রক্রিয়ায় তারা আপনাকে গ্রেফতার করল? তখন রাত ১.৩০, তাই না? কী ঘটেছিল?
 শেখ মুুুজিব : তারা প্রথমে আমার বাড়ির ওপর মেশিনগানের গুলি ছঁড়ল।
ফ্রস্ট : তারা যখন সেখানে পৌঁছল আপনি তখন কোথায় ছিলেন?
শেখ মুজিব : আমি আমার শোবার ঘরে বসেছিলাম। ওটা আমার শোবার ঘর। ওপাশ থেকে মেশিনগানের গুলি ছুঁড়ছিল। এ পাশেও কিছু মেশিনগান থেকে গুলি আসছিল। আর ওপাশের আক্রমণে জানালাগুলো ভেঙে পড়ছিল।
ফ্রস্ট : সবকিছু কি ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল?
শেখ মুজিব : সবকিছু ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল। আমি ছিলাম আমার পরিারের সঙ্গে। গুলি এসে শোবার ঘরে পড়ছিল। আমার ছয় বছরের সন্তান তখন বিছানায় ঘুমোচ্ছিল। আমার স্ত্রীও সেখানে ছিলেন দু’সন্তান নিয়ে।
ফ্রস্ট : সেনাবাহিনী কোন পথে ঘরে প্রবেশ করেছিল?
শেখ মুজিব : সবদিক দিয়ে এবং তারা জানালা দিয়ে গুলি ছুঁড়ছিল। আমি তখন আমার স্ত্রীকে বললাম, দু’সন্তান নিয়ে ঘরে থাকার জন্য। আমি আমার স্ত্রীকে রেখে বেরিয়ে এলাম।
ফ্রস্ট : তিনি তখন কী বললেন?
শেখ মুজিব : একটি কথাও না। আমি তাকে চুমু খেলাম, বিদায় চুমু। দরজা খুলে বেরিয়ে এলাম এবং তাদের বললাম গুলি বন্ধ করার জন্য। আমি বললাম, ‘‘গুলি বন্ধ করো, আমি এখানে। কেন তোমরা গুলি ছুঁড়ছ? কেন?’’ তারা তখন চারপাশ থেকে বেগে আমার দিকে ছুটে আসছে। সবার সঙ্গে বেয়োনেট, তারা তা দিয়ে আমাকে চার্জ করতে উদ্যত। একজন অফিসার ওখানে ছিলেন। তিনি আমায় ধরে তাদের থামালেন। বললেন, ‘‘একে হত্যা করো না।’’
ফ্রস্ট : মাত্র একজন অফিসার তাদের থামালেন?
শেখ মুজিব : হ্যাঁ, তারা আমাকে টেনে হেঁচড়ে নিয়ে চলল। কেউ কেউ পিঠে, পায়ে আঘাত করছিল। কেউ কেউ শরীরের এখানে সেখানে তাদের অস্ত্র ঠেকিয়ে ঠেলে দিচ্ছিল। অফিসারটি তখনো আমাকে ধরে আছেন। এরপরও তারা আমাকে ধাক্কা মারছিল এবং হেঁচড়াচ্ছিল। ‘‘ আমাকে টানা হেঁচড়া করো না।’’ আমি বললাম। এরপর বললাম, ‘‘অপেক্ষা করো, আমার পাইপ আর তামাক আনতে দাও। অথবা আমার স্ত্রীর কাছ থেকে তোমরা নিজেরাই নিয়ে এসো। পাইপটা আমার প্রয়োজন।’’
আমি আবার ঘরে ফিরে এলাম এবং দেখলাম, আমার স্ত্রী দু’সন্তান নিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন। তারা পাইপটা আর ছোট্ট স্যুটকেসটা নিয়ে এসেছে। আমি চললাম তাদের সঙ্গে। চারপাশের সবকিছুতে তখন আগুন জ্বলছে। এভাবেই তারা আমাকে ওখান থেকে নিয়ে এলো।
ফ্রস্ট : আপনি ছেড়ে এলেন আপনার বাড়ি, ধানমন্ডি ৩২, কখনো কি ভেবেছিলেন আবার তা দেখতে পাবেন?
শেখ মুজিব : আমি ভাবিনি। মনে হয়েছিল এই শেষ। কিন্তু যদি মরি নেতা হিসেবে মাথা উঁচু রেখে মরব। অন্ততপক্ষে আমার জন্য আমার দেশবাসী লজ্জিত হবে না; কিন্তু যদি আমি তাদের কাছে আত্মসমর্পণ করি তাহলে আমার জাতি, আমার দেশের মানুষ বিশ্বের কাছে মুখ দেখাতে পারবে না। আমি বরং মরব আমার জনগণের সম্মান রক্ষা করার জন্য।
ফ্রস্ট : একবার আপনি বলেছিলেন, ‘‘তুমি সে লোকটিকে মারতে পারো না যে মরার জন্য প্রস্তুত।’’ আপনি তাই বলেছিলেন?
শেখ মুজিব : আমি তাদের বলেছিলাম যে, সেই মানুষ যে মরার প্রস্তুত-কেউ তাকে মারতে পারে না। শারীরিকভাবে একজন মানুষকে আপনি হত্যা করতে পারেন-কিন্তু মানুষের আত্মাকে কি হত্যা করতে পারেন? পারেন না-এটাই আমার বিশ্বাস। আমি একজন মুসলমান এবং মুসলমান জীবনে একবার মরে, দু’বার না। আমি একজন মানুষ। মানবতাকে আমি ভালোবাসি। আমি এই জাতির নেতা, আমার লোকেরা আমাকে ভালোবাসে আমিও তাদের ভালোবাসি। তাদের কাছে এখন আমার কোনো প্রত্যাশা নেই। তারা আমার জন্য সবকিছু দিয়েছে কারণ আমি তাদের জন্য সবকিছু দিতে প্রস্তুত ছিলাম। আমি তাদের মুক্ত করতে চেয়েছিলাম। মরতে আমার কোনো আপত্তি ছিল না। আমি তাদের সুখী দেখতে চেয়েছিলাম। আমার দেশের মানুষ আমাকে যে ভালোবাসা আর স্নেহ দিয়েছে মনে হলে আমি ভীষণ আবেগাক্রান্ত হয়ে পড়ি।
ফ্রস্ট : পাকিস্তানিরা কি আপনার ঘরের সবকিছু লুট করেছিল?
শেখ মুজিব : আমার ঘরের সবকিছু, এমনকি বিছনাপত্র, আলমারি, কাপড়চোপড় সবকিছু। কিছুই তারা রেখে যায়নি। কিছুই আপনি দেখতে পাবেন না।
ফ্রস্ট : বিল্ডিং মেরামতকারীরা কিছুই নেয়নি, নিয়েছে পাকিস্তানিরা?
শেখ মুজিব : হ্যাঁ, পাকিস্তান সেনাবাহিনী। তারা আমার আলামরি, আসবাবপত্র, পোশাক, বাচ্চাদের পোশাক নিয়েছে বলে আমি মনে কিছু করিনি। মনে করেছি এ জন্য যে,  তারা আমার জীবন ইতিহাস নিয়ে গেছে। গত ৩৫ বছর ধরে আমি ডায়েরি লিখছি আমার রাজনৈতিক জীবন নিয়ে। আমার একটি বিস্ময়কর লাইব্রেরি ছিল। তারা আমার প্রতিটি বই ও গুরুত্বপূর্ণ দলিলপত্র নিয়ে গেছে। প্রতিটি জিনিস পাকিস্তান সেনাবাহিনী নিয়ে গেছে।
ফ্রস্ট : আবারও প্রশ্ন আসছে, প্রশ্ন জাগছে, কেন তারা সবকিছু নিয়ে গেছে?
শেখ মুজিব : আমি জানি না। তারা আসলে মানুষ না। তারা দুষ্কৃতিকারী। তারা উগ্রপন্থী, অমানুষ, অসভ্য সৃষ্টি। আপনি আমার সম্পর্কিত সবকথা ভুলে যান। নিজের বিষয়ে আমি কিছু মনে করি না। ভাবুন, তারা দু’বছরের শিশুকে হত্যা করেছে। পাঁচ বছরের শিশুকে হত্যা করেছে। গ্রামের মহিলাকে। তারা তাদের গরীব হালতে তৈরি করা মাথাগুঁজার ঠাঁইগুলো পুড়িয়ে দিয়েছে। ওইসব কুঁড়ে ঘরে বসত করা চরম ক্ষুধার্ত লোকদেরও তারা হত্যা করেছে। তারা তাদের বাড়ি থেকে বিতাড়িত করেছে এরপর পুড়িয়ে দিয়েছে। এখনো বসবাসের অনুপযুক্ত ওগুলো। তারা চারপাশ থেকে মেশিনগানের গুলি ছুঁড়ে হাজার হাজার মানুষকে হত্যা করেছে।
ফ্রস্ট : আপনি বোঝাতে চাচ্ছেন তারা তাদের জোর করে ঘর থেকে বের করে দিয়েছে। এরপর তারা যখন মুক্ত জায়গায় সমবেত হয়েছে-তারা তখন গুলি করেছে?
শেখ মুজিব : হ্যাঁ, গুলি করেছে।
ফ্রস্ট : তারা জানত না কাদের তারা হত্যা করছে ?
শেখ মুজিব : না।
ফ্রস্ট : তারা যাকে ইচ্ছে তাকে হত্যা করেছে?      
শেখ মুজিব : যাকে ইচ্ছে তাকে। তাদের ধারণা ছিল এরা প্রত্যেকেই শেখ মুজিবের অনুসারী। সুতরাং প্রত্যেককেই হত্যা করা উচিত।
ফ্রস্ট       : আপনি যখন দেখলেন মানুষ মানুষের প্রতি এমন আচরণ করছে, তখন আপনার কি এমন মনে হয়েছিল যে, মানুষ মূলত ভালো কিংবা এমন অনুভূতির সৃষ্টি হয়েছিল যে, মানুষ মূলতই খারাপ?
শেখ মুজিব : ভালো-মন্দ সর্বত্রই রয়েছে। মানবিক গুণাবলির অধিকারী অনেক মানুষ আমি দেখেছি। কিন্তু আমার মনে হয়   পাকিস্তান সেনাবাহিনীর সৈনিকেরা মানুষ নয়। পশুরও অধম তারা। মানুষের মধ্যে পশুর গুণাবলি থাকতে পারে কিন্তু তারা পশুর চেয়ে খারাপ হতে পারে না। কিন্তু ওই লোকগুলো পশুর চেয়েও খারাপ। একটি পশু একজন মানুষকে আক্রমণ করে হত্যা করার জন্য কিন্তু তারা ধরেছে নিপীড়ন করার জন্য। তারা ৫ দিন, ৭দিন, ১৫দিন ধরে নিষ্ঠুর নিপীড়ন চালিয়েছে। এরপর হত্যা করেছে।
ফ্রস্ট       : পাকিস্তানের জেলে আপনার বিচার সম্পর্কে বলুন।
শেখ মুজিব : তারা পাঁচজন সামরিক অফিসার ও কতক বেসামরিক অফিসারের সমন্বয়ে একটি কোর্ট মার্শাল বসিয়েছিল।
ফ্রস্ট : তারা আপনার বিরুদ্ধে কী কী অভিযোগ উত্থাপন করেছিল?
শেখ মুজিব : রাষ্ট্রদ্রোহীতা, পাকিস্তান সরকার ও সামরিক বাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ। বাংলাকে স্বাধীন করার ষড়যন্ত্র ইত্যাদি আরও কত কী! বারোটি অভিযোগের মধ্যে ছ’টিরই শাস্তি ছিল ঝুঁলিয়ে ফাঁসি।
ফ্রস্ট : আপনার পক্ষে কোনো আইনজীবী ছিল না?
শেখ মুজিব  : শুরুতে আমার একজন আইনজীবী ছিল। সরকারই তাকে নিয়োগ করেছিল। কিন্তু চারপাশের পরিস্থিতি এবং আমার অবস্থান যখন বিবেচনা করলাম মনে হলো, এটা তো লোক দেখানো বিচার, বিচারের নামে প্রহসন। এতে যুক্তিতর্কের কী মূল্য আছে? দাঁড়িয়ে বললাম, জনাব বিচারপতি, আমার পক্ষ সমর্থনকারী আইনজীবীকে চলে যেতে বলুন। কারণ আপনি জানেন এটা গোপন বিচার। আমি একজন বেসমারিক লোক। আমি সামরিক বাহিনীর কেউ নই, এরপরও তারা আমার বিরুদ্ধে কোর্ট মার্শাল বসিয়েছে। মি. ইয়াহিয়া খান শুধু প্রেসিডেন্টই নন-চিপ মার্শাল ল অ্যাডমিনিস্ট্রেটরও। এই আদালতের প্রধান তিনি রায়ও তার নির্দেশেই হবে।
ফ্রস্ট : সুতরাং শেষমেশ যে কোনো সিদ্ধান্ত তিনি চাপিয়ে দিতে পারতেন?
শেখ মুজিব : যে কোনো সিদ্ধান্ত তিনি দিতে পারতেন।
ফ্রস্ট :  আপনি কি আদালতে যাচ্ছিলেন নাকি যাওয়া বন্ধ করে দিয়েছিলেন?
শেখ মুজিব : হ্যাঁ, যেতে হচ্ছিল, কারণ আমি একজন বন্দি।
ফ্রস্ট : আমার ধারণা কোনো ব্যাপারে কিছু বলার যথেষ্ট স্বাধীনতা আপনার ছিল না। তারা কি সরকারিভাবে কোনো রায় প্রস্তুত করেছিল?
শেখ মুজিব :  কোর্টের কাজ শেষ হলো ৪ ডিসেম্বর (১৯৭১), তৎক্ষণাৎ ইয়াহিয়া খান সকল বিচারক অর্থাৎ কর্নেল, ব্রিগেডিয়ারদের রাওয়ালপিণ্ডিতে জড়ো হওয়ার নির্দেশ দিলেন-রায় প্রস্তুত করার জন্য। ওখানে সিদ্ধান্ত হলো-আমাকে ফাঁসিতে ঝুলাবে। 
ফ্রস্ট : এবং এ হেন পরিস্থিতিতে, আমার বিশ্বাস যে আপনি আবিষ্কার করলেন তারা আপনার বন্দিখানার পাশেই কবর খুঁড়ছে।
শেখ মুজিব : হ্যাঁ, ঠিক আমার কয়েদখানার পাশেই তারা একটি কবর খুঁড়ল। আমি তা দেখেছিলাম।
ফ্রস্ট : আপনি বুঝতে পেরেছিলেন তারা কবর খুঁড়ছে?
শেখ মুজিব : হ্যাঁ, নিজের চোখে তা দেখেছি এবং আমি নিজেকে বলেছিলাম, ‘‘ এ কবর সম্ভবত আমারই জন্য খোঁড়া হচ্ছে, ঠিক আছে. আমি প্রস্তুত।
ফ্রস্ট : তারা কি বলেছিল-এটা আপনার কবর?’’
শেখ মুজিব : না, তারা তা বলেনি।
ফ্রস্ট : তারা কী বলেছিল?
শেখ মুজিব : তারা বলেছিল, ‘‘না, না, না, না। আমরা একটা ব্যবস্থা করে রাখছি যদি বোমা পড়ে আপনি তাতে আশ্রয় নিতে পারবেন।’’
ফ্রস্ট : ঠিক ওই মুহূর্তে আপনার কী মনে হয়েছিল? আপনার কি মনে হয়েছিল-গত নয় মাস ধরেই আমি মৃত্যুর কাছাকাছি আছি?
শেখ মুজিব : আমি জানতাম, নয় মাসের যে কোনোদিন তারা আমাকে মেরে ফেলতে পারত। কারণ তারা অসভ্য।
ফ্রস্ট : ওই সময়টার মোকাবেলা আপনি কীভাবে করেছেন? প্রার্থনা করে?
শেখ মুজিব : দৃঢ় বিশ্বাস আর অটল নীতির দ্বারা আমি ওই দুঃসময়ের মোকাবেলা করতে পেরেছি। আমি জানতাম, ৭৫ মিলিয়ন মানুষ আমাকে ভালোবাসে, তাদের ভাইয়ের মতো, বাবার মতো। তাদের ভালোবাসার নেতা আমি।
ফ্রস্ট : এবং আপনি যখন দেখলেন তারা আপনার কয়েদখানার পাশে করব খুঁড়ছে নিশ্চয়ই আপনার মনে হয়েছিল-সবকিছু পেছনে ফেলে আপনি চলে যাচ্ছেন। আপনি কি আপনার দেশের কথা ভাবছিলেন? নাকি, উদাহরণস্বরূপ, আপনার স্ত্রী এবং সন্তানদের কথা ভাবছিলেন?
শেখ মুজিব : প্রথমেই আমি আমার দেশের কথা ভেবেছি, জনগণের কথা ভেবেছি। পরে ভেবেছিল পরিবারের কথা। আমি আমার মানুষদের সবচেয়ে বেশি ভালোবাসি। আমার উদ্বেগ শুধু তাদের জন্যই। আপনি জানেন তারা আমাকে কতটা ভালোবাসে।
শেখ মুজিব: একজন নেতা হিসেবে, যেমন আপনি বাংলাদেশের নেতা, দেশটির স্বাধীনতার জন্য যুদ্ধ করেছেন, আপনার উচিত প্রথমে দেশের মানুষের কথা ভাবা, পরে পরিবার এটাই তো স্বাভাবিক।
শেখ মুজিব: হ্যাঁ, প্রথমেই আমি আমার জনগণকে ভালোবাসি। আমি জানি, মানুষ একদিন থাকবে না, আজ, কাল না হোক পরশু। সুতরাং প্রতিটি মানুষেরই উচিত বীরত্বের সঙ্গে মরা।
ফ্রস্ট : এবং কে আপনাকে ওই কবরে যাওয়া থেকে রক্ষা করেছিল?
শেখ মুজিব: আমি মনে করি, আল্লাহ, সর্বশক্তিমান আল্লাহ আমাকে রক্ষা করেছিলেন।
ফ্রস্ট : কোথাও পড়েছি, কোন এক পর্যায়ে জেলার সাহেব আপনাকে সরিয়ে নিয়েছিলেন। কখন? ইয়াহিয়া যখন এসেছিল আপনাকে নিয়ে হত্যা করার জন্য?
শেখ মুজিব: তারা জেলের মধ্যে একটি পরিস্থিতি সৃষ্টি করেছিল এবং কিছু কয়েদীকে জড়ো করেছিল সকালের দিকে আমার ওপর হামলা চালানোর জন্য, যাতে আমাকে মেরে ফেলতে পারে। যে অফিসারের দায়িত্বে আমি ছিলাম তিনি সম্ভবত আমাকে কিছুটা পছন্দ করতেন। আমি মনে করি, তিনি হয়তো জানতেন, ইয়াহিয়া খানের দিন শেষ হয়ে এসেছে। রাত ৩ টার দিকে তিনি আমাকে জেল থেকে তার বাংলোতে নিয়ে গেলেন। দু’দিন ওখানে থাকলাম মিলিটারি পাহারা ছাড়া। দু’দিন পর তিনি আমাকে কলোনির ভেতর আরেকটি নির্জন জায়গায় নিয়ে গেলেন। ওখানে তিনি আমাকে চার, পাঁচ অথবা ছয়দিন রাখলেন। নিম্নপদস্থ কিছু কর্মচারি ছাড়া কেউ জানতো না আমার অবস্থান।
ফ্রস্ট : পরে তাদের কী হয়েছে সেটাই ভাবছি।
শেখ মুজিব: জানি না। ভাবতে চাই না-তারা তাদের সঙ্গে যা ইচ্ছে করেছে? কিন্তুতাদের জন্য আমার শুভ কামনা আছে।
ফ্রস্ট : শুনেছি ইয়াহিয়া খান যখন মি. ভুট্টোর কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করল-তখনো আপনাকে ফাঁসি দিতে বলল, সত্য কি?
শেখ মুজিব: হ্যাঁ, খুবই সত্য কথা। আর এ ব্যাপারে সবচেয়ে মজার গল্পটি হলো: মি. ভুট্টোই পরে আমাকে বলিছিলেন, ইয়াহিয়া খান ক্ষমতা হস্তান্তর করার সময় তাকে বলেছিলেন, ‘‘শেখ মুজিবুর রহমাকে ফাঁসিতে না ঝুঁলিয়ে আমি সবচেয়ে বড় ভুল করেছি।’’
ফ্রস্ট : তিনি তা বলেছিলেন?
শেখ মুজিব: হ্যাঁ, তিনি আরও বলেছিলেন, ‘‘ক্ষমতা হস্তান্তরের আগে আমার একটা অনুরোধ, দয়া করে রাখবেন। পেছনের একটি তারিখ দিয়ে মুজিবুর রহামানকে ফাঁসি দেবেন।’’ কিন্তু ভুট্টো তার প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেন।
ফ্রস্ট : ভুট্টো কী বলেছিল-আপনাকে জানিয়েছিল?
শেখ মুজিব: হ্যাঁ।
ফ্রস্ট : কী বলেছিল?
শেখ মুজিব: ভুট্টো বলেছিল যে,  আমি পারব না কারণ এখন এটা করলে ভীষণ প্রতিক্রিয়া হবে। সামরিক বাহিনীর এক লাখ বিশ হাজার এবং বে-সামরিক লোক এখন বাংলাদেশে বন্দি, বাংলাদেশ-ভারত যৌথ বাহিনীর হাতে এবং পাঁচ থেকে দশ লাখ অবাঙালি সেখানে বাংলাদেশে রয়েছে। এ মুহূর্তে মুজিবকে হত্যা করলে বাংলাদেশ থেকে একটা লোকও পশ্চিম পাকিস্তানে জীবীত ফিরবে না। ফলে পশ্চিম পাকিস্তানে মারাত্মক প্রতিক্রিয়া দেখা দেবে। আমার জন্য তা হবে ভয়াবহ।’’ মি. ভুট্টোর কাছে আমি এ জন্য কৃতজ্ঞ-এ ব্যাপারে সন্দেহ নেই।
ফ্রস্ট : আজ যদি ইয়াহিয়াকে আপনি সামনে পেতেন-কী বলতেন?
শেখ মুজিব: সে একটি জঘন্য লোক, আমি তার ছবিও দেখতে চাই না। সে তার সৈনিকদের দিয়ে আমার ৩ মিলিয়ন (৩০ লাখ) বাংলাদেশিকে হত্যা করেছে।
ফ্রস্ট : মি. ভুট্টো তাকে গৃহবন্দি করেছে, ভুট্টো তাকে কী করতে পারে  বলে আপনি মনে করেন?
শেখ মুজিব: আপনি জানেন বাংলা দেশে কী ঘটেছে? আমি বলছি শুনুন, তিন মিলিয়ন লোক শহীদ হয়েছে, তাদের মধ্যে শিশু, মহিলা, বুদ্ধিজীবী, কৃষক, শ্রমিক, ছাত্র রয়েছে। কমপক্ষে ২৫% থেকে ৩০% ঘরবাড়ি পুড়িয়ে দিয়েছে, লুট হয়েছে সবকিছু। সকল খাদ্যগুদাম ধ্বংস হয়েছে।
ফ্রস্ট : আপনি কী করে জানেন যে সংখ্যাটা সর্বোচ্চ ৩ মিলিয়ন?
শেখ মুজিব: আমার দেশে ফেরার আগেই আমার লোকেরা তথ্য সংগ্রহ করতে শুরু করেছিল। সকল অঞ্চল থেকে যেখানে যেখানে আমাদের ঘাঁটি ছিল, আমি খবর পেয়েছি। আমরা এখনো উপসংহারে পৌঁছিনি, এ সংখ্যা আরও বাড়তে পারে, তো তিন মিলিয়নের কম তো হবেই না।
ফ্রস্ট : এবং নিরর্থক এ হত্যাকাণ্ড ? তারা লোকদের ঘর থেকে টেনে বের করেছে আর....  
শেখ মুজিব : হ্যাঁ, ওরা আসলে নিজেদের গ্রামে বসবাস করা শান্তিপ্রিয় নিরীহ মানুষ। তারা দুনিয়ার কোন খোঁজ রাখত না। সশস্ত্র বাহিনীর লোকেরা সেখানে গেল আর গুলি ছুঁড়তে শুরু করল যেন পাখি মারছে।
ফ্রস্ট : কেন, কেন, কেন?
শেখ মুজিব : আমি জানি না। বুঝতে পারি না। পৃথিবীর কোথাও এমনটি আর কখনো ঘটেনি। বিশ্বের ইতিহাসে এমন ঘটনার নজির পাওয়া যাবে না।
ফ্রস্ট : এবং ওটা ছিল মুসলমানদের মুসলমান হত্যা?
শেখ মুজিব : তারা মুসলিম দাবি করে। মুসলমান কীভাবে মুসলাম মেয়েদের হত্যা করে? আমরা হাজার হাজার মেয়েকে উদ্ধার করেছি। তাদের অনেকেই এখনো আমাদের ছাউনিগুলোতে রয়েছে। তাদের স্বামীকে, পিতাকে হত্যা করা হয়েছে। পিতা-মাতার সামনে তারা মেয়েকে ধর্ষণ করেছে। পুত্র সন্তানের সামনে তারা মাকে ধর্ষণ করেছে। আপনি এমনটি কল্পনাও করতে পারবেন না। আমি আমার চোখের পারি ধরে রাখতে পারছি না। এমন লোকেরা কেমন করে নিজেদের মুসলমান দাবি করে? তারা পশুরও অধম। আমার একজন বন্ধু ছিলেন, আমার দলের উচ্চ সারির নেতা, মি. মশিউর রহমান (তিনি খোলাখুলি কাঁদছেন)। তিনি বাংলাদেশ সরকারের সাবেক মন্ত্রি। তারা তার ওপর ভয়াবহ নিপীড়ন চালাল এরপর হত্যা করল। ২৪ দিন ধরে অকথ্য নিপীড়ন চালাল, প্রথমে একটা হাত কেটে ফেলল। এরপর বাঁ পা, এরপর দু’টি কান এরপর পা...এভাবে ২৪ দিন। আহ্, মানুষ কত অসহায়! আমি শুধু আপনাকে একটা ঘটনা বলেছি। অনেক নেতা, কর্মী, বুদ্ধিজীবী, সরকারের কর্মকতাকে তারা ধরে নিয়ে নিপীড়ন করে হত্যা করেছে। ৭ দিন, ১০ দিন ধরে অত্যাচার চালিয়েছে এরপর হত্যা করেছে। ইতিহাসে এমন অমানবিক নিপীড়নের কথা শোনা যায় না। এমনকি পশু, এমনকি বাঘও মানুষকে হত্যা করে কিন্তু এমন অত্যাচার করে না।
ফ্রস্ট : এবং এভাবে তারা কী অর্জন করতে চেয়েছিল?
শেখ মুজিব: তারা এ দেশকে উপনিবেশ বানিয়ে রাখতে চেয়েছিল। আপনি জানেন, তারা আমার পুলিশ বাহিনীকে হত্যা করেছে, বাঙালি পুলিশ, বাঙালি সৈনিক, বাঙালি অধ্যাপক, শিক্ষক, ইঞ্জিনিয়ার, ডাক্তার, যুকব ছাত্র-জনতা। সকল পেশার লোকদের তারা হত্যা করেছে।
ফ্রস্ট : এমনকি যুদ্ধ শেষ হয়ে যাওয়ার প্রাক্কালেও তারা এখানে, এই ঢাকায় ১৩০ জন বুদ্ধিজীবীকে ঘর থেকে তুলে এনে হত্যা করেছে।
শেখ মুজিব: আত্মসমর্পণের ঠিক একদিন আগে। এবং শুধু ঢাকায়। তারা বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়, মেডিক্যাল কলেজ, প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের ৩০০জন বুদ্ধিজীবীকে হত্যা করেছে, ১৩০ জন নয়। তাদের হত্যা করেছে নিজেদের ঘরে। আরেকটি মর্মান্তিক ঘটনা আমি আপনাকে বলব, তারা কারফিউ জারি করেছিল যাতে লোকেরা ঘর থেকে বের হতে না পারে। এরপর ঘরে ঘরে হানা দিয়ে তাদের হত্যা করেছে।
ফ্রস্ট : কারফিউ দিয়েছিল যাতে লোকেরা জানতে না পারে কী ঘটছে?
শেখ মুজিব: হ্যাঁ।
ফ্রস্ট : আপনি কি মনে করেন ইয়াহিয়া খান একটা শয়তান ছিল যে অন্যের প্ররোচনাতে এমনটি করেছিল? নাকি ব্যক্তি ইয়াহিয়াই ছিল একটা শয়তান।
শেখ মুজিব: সে নিজেই ছিল একটা শয়তান। তারই সহকর্মীরাই এসব কথা জানিয়েছে। আপনি অন্যদের ঘাড়ে দোষ চাপাতে পারেন না। কারণ সে নিজেই ছিল ভ , ভয়ানক চরিত্রের মানুষ। তার প্রেসডেন্ট থাকাকালে সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণের নেতা হিসেবে তার সঙ্গে যখন আমার আলাপ হয়েছিল তখনই বুঝেছিলাম।
ফ্রস্ট : তিনি আপনাকে বিভ্রান্ত করেছিলেন? তাই না?
শেখ মুজিব: না, সে আমাকে বিভ্রান্ত করতে পারেনি। আমি বুঝতে পেরেছিলাম সে কি করতে যাচ্ছে। আমি তাকে আঘাত করার প্রস্তুতি নিচ্ছিলাম এবং এখন সে আঘাতের মুখোমুখি।
ফ্রস্ট : কী প্রস্তুতি?
শেখ মুজিব: পেছন থেকে আঘাত করা। এবং সে আঘাত সে পেয়েছে।
ফ্রস্ট : পাকিস্তানের কারাগারে বন্দি থাকাকালে আপনি কখনো তাকে দেখেছিলেন?
শেখ মুজিব: না। সে তো মানুষ না।
ফ্রস্ট : এখন কী মনে করেন মি. ভুট্টোর জন্য সঠিক কাজ কোনটি?
শেখ মুজিব: তাকে বিচারের মুখোমুখি করা, একটি উন্মুক্ত বিচার তার হোক আমি চাই।
ফ্রস্ট : তিনি এখন গৃহবন্দি। আপনি কি মনে করেন মি. ভুট্টো তাকে বিচারের মুখোমুখি করবে?
শেখ মুজিব: মনে হয় করবে।
ফ্রস্ট : মি. ভুট্টোর ব্যাপারে আপনি ভাবেন? আপনি কি মনে করেন, পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী বা প্রেসেিডন্ট হিসেবে তিনি একদিন মুক্ত ঢাকায় আসবেন? আসবেন কি কখনো কথা বলার জন্য?
শেখ মুজিব: জানি না। আপনি বরং তাকে এই বাস্তবতা উপলব্ধি করতে দিন যে, বাংলাদেশ এখন একটি স্বাধীন দেশ। এটি এখন তাদের অঙ্গরাজ্য বা উপনিবেশ নয়। এ নিয়ে আর কোনো উচ্চবাচ্য চলবে না। সকল বাস্তবতা নিরিখেই বলছি, তারা যদি এক পাকিস্তান দাবি করে তাহলে আপনি জেনে রাখুন পশ্চিম পাকিস্তানসহ নিজেকে আমি পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট দাবী করতে পারি, যেহেতু সেটি পাকিস্তানেরই অংশ এবং আমি নির্বাচনে সংখ্যা গরিষ্ঠতা পেয়েছি। অবশ্য যদি তারা গণতন্ত্রে বিশ্বাস করে। সংখ্যাগরিষ্ঠতার বিচারে আমি একটি সম্মেলন আহ্বান করতে পারি সমগ্র অঞ্চলকে বাংলাদেশ ঘোষণা দেয়ার জন্য। এবং এ কথা বলার জন্য  যে পশ্চিম পাকিস্তান আমার অঙ্গরাজ্য। আপনি মি. ভুট্টো, দূর হয়ে যান। আমি গভর্নর নিয়োগ করছি। এটা আমার অঙ্গরাজ্য। আপনি দূর হন, নাহলে আমি মিত্রবাহিনীর সঙ্গে আমার সেনাবাহিনী পাঠাব পশ্চিম পাকিস্তান দখল করার জন্য। কিন্তু এমন গো গোল আমি চাই না। কোনো অঙ্গরাজ্যের উচ্চাকাক্সক্ষা আমার নেই। পশ্চিম পাকিস্তান নিয়ে ভট্টো সুখী হোক। আমি সুখী হতে আমার বাংলাদেশি জনগণ নিয়ে। বাংলাদেশ এখন একটি স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্র।
ফ্রস্ট : বাংলাদেশের ৭,৫০০,০০০ লোকের মধ্যে কত এখন ক্ষুধার্ত, এটাকে কি দুর্ভিক্ষাবস্থা বলা যায়?
শেখ মুজিব: আমার ধারণা ৭৫% মানুষ।
ফ্রস্ট : ৭৫%?
শেখ মুজিব: হ্যাঁ, কারণ তাদের ধ্বংসযজ্ঞ। এমনকি যাদের সামর্থ ছিল নিজের ঘরের খাবারের তাদেরগুলো সব লুট হয়ে গেছে। এমনকি খুবই সামান্য অর্থের মালিক তাদেরও সে অর্থ লুট হয়ে গেছে। আমার মনে হয় এই সংখ্যা ৭৫% নয়, ৮৫% মানুষ এখন খুব খারাপ অবস্থায় রয়েছে। আমার লোকেরা খুব ভালো এবং শান্তিপ্রিয়। তাদের পূর্ণ বিশ্বাস রয়েছে আমার ওপর। তারা আমার জন্য অপেক্ষা করছে তাদের জন্য কিছু একটা ব্যবস্থা করার জন্য। আমি খুব খুশি যে, ভারত বন্ধুত্বের নিদর্শন স্বরূপ আমার সাহায্যে এগিয়ে এসেছে-যাতে আমার মেশিনসমূহ চালু হতে পারে। যোগাযোগ ব্যবস্থা পুনঃ স্থাপন করতে হবে। কারণ আত্মসমর্পণের আগে পাকিস্তানিরা রেলওয়ে, বড় বড় সড়ক সেতু, তেল সংরক্ষণাগার এবং শিল্পকারাখানা ইত্যাদি সব ধ্বংস করে গেছে। মানুষের পক্ষে সম্ভব সব ধরনের ধ্বংসযজ্ঞ তারা সাধন করেছে।
ফ্রস্ট : স্বাধীন দেশটির পুনর্গঠনে প্রথম সপ্তাহেই আপনার অনেক কাজ। আপনি অবশ্য ইতোমধ্যেই, উদাহরণস্বরূপ, জাতীয় পতাকা ও জাতীয় সঙ্গীত নির্বাচন করে ফেলেছেন।
শেখ মুজিব: হ্যাঁ, পতাকাটি বহু পূর্ব থেকেই ব্যবহৃত হয়ে আসছে।  বর্তমানে এর ছোট্ট একটি পরিবর্তন করা হয়েছে মাত্র। আর এই সঙ্গীতটি বহু আগে থেকেই আমাদের জাতীয় সঙ্গীত, আমি শুধু এর একটি অফিসিয়াল পরিচিতি বা স্বীকৃতি দিয়েছি। আমাদের পতাকার ছোট্ট একটি পরিবর্তন আমি করেছি কারণ আমাদের পতাকাতেই ধরা ছিল আমাদের দেশের মানচিত্র। কোনো দেশের জাতীয় পতাকাতেই তার দেশের সীমানা ধরা নেই।
ফ্রস্ট : কী কারণে এটা করা হয়েছে?
শেখ মুজিব : বিশ্বের কোথাও এমনটি নেই। আমরাও চাইনি জাতীয় পতাকায় দেশের সীমানা নির্ধারক মানচিত্র থাকুক। এরপর আমি তা করেছি, আমার জনগণও পছন্দ করেছে। দেশের পতাকা থেকে মানচিত্র অপসারণ করে সূর্যোদয় রাখা হয়েছে।
 ফ্রস্ট : আপনাদের জাতীয় সঙ্গীতের রচয়িতা কে?
শেখ মুজিব : রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, এটি তাঁর এটি পুরনো গান।
ফ্রস্ট : ইংরেজিতে এটিকে কী বলা যায়?
শেখ মুজিব : ইংরেজিতে বলা যায়, ‘‘ আই লাভ মাই গোল্ডেন বেঙ্গল’’। ‘‘ গোল্ডেন বেঙ্গল, আই লাভ ইউ।’’ এই বাক্য দিয়ে শুরু।
ফ্রস্ট : এবং এই সঙ্গীতটি বহু বছর ধরে বাংলাদেশে গীত হচ্ছে?
শেখ মুজিব : বহু বছর ধরে। ৭ মার্চ (১৯৭১), যখন রেস কোর্স ময়দানে আমি শেষ জনসভা করি-সেখানে এক মিলিয়ন মানুষ উপস্থিত হয়েছিল। এবং তারা স্বাধীন বাংলাদেশের পক্ষে শ্লোগান দিয়েছিল। বাচ্চা ছেলেরা তখন গানটি গাইছিল। আমরা ১০ লাখ মানুষ সেদিন দাঁড়িয়ে সম্মান প্রদর্শন (স্যালুট) করেছি এই সঙ্গীতকে।  ওই সময়ই গৃহিত হয়ে গেছে আমাদের এই জাতীয় সঙ্গীত।
ফ্রস্ট : আপনি কি মনে করেন যে, ৭ মার্চ রেস কোর্সের ভাষণে বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়েছিলেন?
শেখ মুজিব : আমি জানতাম যা ঘটতে যাচ্ছিল। তাই ওই সম্মেলনেই আমি  ঘোষণা দিয়েছিলাম, এবাবের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম, শিখল ভাঙার সংগ্রাম ও মুক্তির সংগ্রাম।
ফ্রস্ট :  আপনি যদি সেদিন বলতেন, ‘‘আমি, আজ বাংলাদেশকে স্বাধীন রাষ্ট্র ঘোষাণা করছি’’, তাহলে কী হতো?
শেখ মুজিব : সেদিনই আমি তা করতে চাইনি। বিশেষত এই কারণে যে, আমি বিশ্বকে তাদের বলার সুযোগ দিইনি যে, শেখ মুজিবুর রহমান স্বাধীনতা ঘোষণা করেছে। আমাদের অন্য কোনো বিকল্প ছিল না শুধু পাল্টা আঘাত করা ছাড়া। আমি চেয়েছিলাম আগে তারা আমাদের আঘাত করুক এবং আমার জনগণ জবাব দেয়ার জন্য প্রস্তুত ছিল।
ফ্রস্ট : অর্থাৎ আপনি তা শুরু করতে চাননি?
শেখ মুজিব : না, আমি চেয়েছিলাম তারা শুরু করুক।
ফ্রস্ট : বাংলাদেশকে ব্রিটেন কখন স্বীকৃতি দেবে বলে আপনি মনে করেন?
শেখ মুজিব : যে কোনো সময় আমি তা প্রত্যাশা করি। ব্রিটিশদের আমি জানি।
ফ্রস্ট : মি. হেথের সঙ্গে লন্ডনে আপনি কথা বলেছিলেন?
শেখ মুজিব : আমি মি. হেথের সঙ্গে কথা বলেছিলাম। কথা বলেছিলাম মি. উইলসনের সঙ্গে। তাদের সঙ্গে কথা বলে আমি খুশি।
ফ্রস্ট : এবং আপনি ইংলিশ তামাকে ধূমপান করেন?
শেখ মুজিব : হ্যাঁ, বহুদিন ধরে?
ফ্রস্ট : এটা কোন তামাক?
শেখ মুজিব : এডিন মুর’স।
ফ্রস্ট : আপনি এটা পছন্দ করেন?
শেখ মুজিব : আমি এটি পছন্দ করি। প্রায় ১৪ বছর ধরে আমি ধূমপান করছি এমনকি জেলে থাকার সময়ও। আমি তাদের বলেছিলাম, অবশ্যই এ তামাক দিতে হবে, তারা দয়া করে তা সরবরাহ করেছিল।
ফ্রস্ট : এমনকি নির্জন সেলেও?
শেখ মুজিব : অন্তত এর জন্য আমি তাদের ধন্যবাদ দিই। (হাসি)
ফ্রস্ট : এটা একটা ক্ষুধার্ত শহর। কিন্তু সুখী শহরও। এখন পর্যন্ত কি জানতে পেরেছেন-কত টাকা আপনার দরকার?
শেখ মুজিব : এখন আমি বলতে পারব না। কিছুই বলতে পারব না। তারা এখান থেকে যাবার সময় ব্যাঙ্ক নোটগুলোতে আগুন দিয়ে গেছে। আত্মসমর্পণের আগের ব্যাঙ্কের সবটাকা একত্র করে আগুন দিয়েছে।
ফ্রস্ট : এবং এরপর পূর্ব পাকিস্তানের বাকি অর্থ (টাকা), আগেরই মতো রয়ে যাবে, যেমন ছিল পশ্চিম পাকিস্তানে?
শেখ মুজিব : ওখানে কিছু নেই। আমি আমার লোকদের বলেছি স্বর্ণ দিতে, যা কিছু তাদের আছে। তারা তা দেবে।
 শেখ মুজিব ও ফিদেল ক্যাস্ট্রো

ফ্রস্ট : তারা স্বর্ণ দেবে আর তা দিয়ে স্বর্ণের রিজার্ভস গড়ে উঠবে?
শেখ মুজিব : এটা একমাত্র বিকল্প এখন আমার সামনে। সম্ভবত আগামীকাল কিংবা পরশু আমি জাতির কাছে আবেদন জানাব। তোমাদের যা কিছু আছে, তা থেকে কিছু অলঙ্কার আমায় দাও। সরকারি ব্যাঙ্কে বন্ধক রাখো যাতে আমি কিছুটা রিজার্ভ গড়ে তুলতে পারি। কিন্তু তাদের কিছু নেই। দোকানসমূহে লুট হয়েছে, স্বর্ণের দোকানসমূহেও। এর বেশি কিছু বলতে পারব না আমি।
ফ্রস্ট :  কিন্তু, আমি বুঝি না, লোকেরা কোথা থেকে স্বর্ণ দেবে?
শেখ মুজিব : যা সামান্য তাদের আছে।
ফ্রস্ট : আপনি কি আরেকবার দেখবেন কোনো রিজার্ভ পশ্চিম পাকিস্তানে আছে কিনা?
শেখ মুজিব : আপনি জানেন, পৃথিবীর কাছে তারা একটি প্রতিশ্র“তি দিয়েছে। তারা ২,০০০ কোটি টাকা লোন নিয়েছিল, এর খুবই সামান্য অংশ তারা বাংলাদেশের জন্য খরচ করেছে। এখন পাকিস্তান শুধু পশ্চিমে। আমরা পাকিস্তানি বাংলাদেশ নই।  আমার কোনো দায়ীত্ব নেই। এই ঋণ কাটিয়ে ওঠা তাদের পক্ষে কঠিন। ২,০০০ কোটি টাকা ঋণ শোধ করতে হবে কিন্তু শিল্পপণ্যের কোনো বাজার নেই। তারা কী করবে? ভয়ানক বেকারত্ব দেখা দেবে সেখানে।
ফ্রস্ট : তারা বলে, বাংলাদেশ পরিচালনার জন্য আপনি অনেক বেশি ক্ষমতা পেয়েছেন। একটি পুরনো প্রবাদ আছে-ক্ষমতা দুর্নীতি ডেকে আনে, চরম ক্ষমতা দুর্নীতিগ্রস্থও করে চরমভাবে। এখন ক্ষমতার কারণে দুর্নীতিগ্রস্থ হয়ে পড়া থেকে নিজেকে রক্ষা করবেন কীভাবে?
শেখ মুজিব : আপনি জানেন, ইয়াহিয়া খান ক্ষমতায় এসেছে হঠাৎ করে, দুর্ঘটনাবশত। সে দুর্নীতিগ্রস্থ হয়ে পড়তে পারে। কিন্তু যে লোক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে, সংগ্রাম করে, কষ্ট পেয়ে, যুদ্ধ করে, সে ক্ষমতায় গেলে দুর্নীতিগ্রস্থ হয়ে পড়ে না। আমার দল আর আমি পরস্পর সম্পর্কাবদ্ধ। আমার দলের সকল নেতা জেল খেটেছে, কেউ ঘরবাড়ি হারিয়েছে, কেউ পরিবারের সদস্য হারিয়েছে। চব্বিশ বছর পরে তারা ক্ষমতা পেয়েছে। তারা চমর ক্ষমতা পেলেও দুর্নীতিগ্রস্থ হবার সম্ভাবনা নেই। কারণ তারা তৈরি হয়েছে রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে, ইয়াহিয়া খান কিংবা অন্য কারও মতো নয়-যারা পাশবিক শক্তি আর বন্দুক ব্যবহার করেছে ক্ষমতায় আসার জন্য। আমার লোকেরা ক্ষমতায় এসেছে বন্দুকের মাধ্যমে একথা ঠিক কিন্তু স্বাধীনতা অজর্নের জন্য অনেক ত্যাগ তারা স্বীকার করেছে। কারণ তারা তাদের দেশ ও দেশের ভালোবাসে। আমার দলের নেতা ও কর্মীদের প্রতি আমার বিশ্বাস আছে।
ফ্রস্ট : আপনি নেতার কথা বলেছেন? নেতা কী? উদাহরণস্বরূপ, আপনাকে যদি বিশ্ব নেতৃত্বের সংজ্ঞা দিতে বলা হয়, কী বলবেন? সত্যিকারের নেতৃত্ব কী?
শেখ মুজিব :  নেতৃত্ব আসে একটি প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে। একজন মানুষ দুর্ঘটনাক্রমে একদিনে নেতা হতে পারে না। একটি প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে তাকে আসতে হয়, বহু সংগ্রামের পর। নিজেকে তার প্রমাণ করতে হয় এবং উঠতে হয় ব্যক্তিগত স্বার্থের উর্ধ্বে। মানবতার স্বার্থে নিজেকে কুরবানী দেয়ার মানসিকতা তার থাকতে হবে। অবশ্যই তার নীতি থাকতে হবে, একটি ভাবাদর্শ থাকতে হবে। একজন নেতার যদি এসব গুণাবলি থাকে তবে তিনি নেতা।
ফ্রস্ট : বিশ্ব ইতিহাসের কোন কোন নেতাদের আপনি প্রশংসা করেন?
শেখ মুজিব : বহু নেতাকে আমি চিনি। বর্তমানে যারা নেতৃত্বে আছেন তাদের নাম আমি উল্লেখ করতে চাই না।
ফ্রস্ট : আসুন আমরা ইতিহাসের দিকে তাকাই। কারা আপনাকে অনুপাণিত করেছেন?
শেখ মুজিব : আব্রাহিম লিঙ্কন, মাও সেতুং, লেনিন, চার্চিলের আমি প্রশংসা করি। আমেরিকার সাবেক প্রেসিডেন্ট মি. কেনেডিকে বরাবরই আমি পছন্দ করি।
ফ্রস্ট : আপনি কি ওই সাবেক প্রেসিডেন্টের সঙ্গে দেখা করেছিলেন?
শেখ মুজিব : তাঁর সঙ্গে আমার দেখা হয়নি কিন্তু তার বই আমি পড়েছি। আমি তাঁকে পছন্দ করি।
ফ্রস্ট : মহাত্মা গান্ধী সম্পর্কে আপনি কী বলবেন?
শেখ মুজিব : মহাত্মা গান্ধীর প্রতি আমার রয়েছে অগাধ শ্রদ্ধা। পি ত জহরলাল নেহেরু, নেতাজি সুবাস চন্দ্র বসু, ফাজ-উল-হক, এবং কামাল আতাতুর্ক।  ড. সুকর্নের আমি প্রশংসা করি উপনিবেশের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে দেশের মানুষকে মুক্ত করার জন্য। তাঁর প্রতিও রয়েছে আমার অগাধ প্রশংসা। এই সকল নেতাই তৈরি হয়েছিলেন সংগ্রামের মধ্য দিয়ে।
ফ্রস্ট : এই মুহূর্তে আপনি যদি পেছনের দিকে ফিরে তাকান তাহলে গত বছরের কোন মুহূর্তটাকে সবচেয়ে আনন্দের বলে মনে হয়? কোন মুহূর্তটা আপনার জীবনের সবচেয়ে বেশি সুখ এনে দিয়েছে?
শেখ মুজিব : সেইদিন যেদিন আমি শুনেছিলাম আমার দেশের মানুষের মুক্তি ঘটেছে। আমার মানুষেরা স্বাধীন হয়েছে। এবং আমি বাংলাদেশ পেয়েছি। স্বাধীন সার্বভৌম একটি দেশ। ওটাই আমার জীবনের সবচেয়ে সুখের দিন।
ফ্রস্ট : আপনার সারা জীবনের?
শেখ মুজিব : সারা জীবনের।
ফ্রস্ট : এমন একটি দিনের স্বপ্ন আপনি কত আগে থেকে দেখছেন?
শেখ মুজিব : বহু আগে থেকে।
ফ্রস্ট : স্বাধীনতার জন্য সংগ্রাম করতে গিয়ে জীবনে প্রথম কখন জেলে গেছেন?
শেখ মুজিব : আমি মনে করি, আমি জেলে যেতে শুরু করেছি তথাকথিত পাকিস্তানের ১৯৪৮ সাল থেকে।  ১৯৫৪ সালে আমি গ্রেফতার হয়েছি। ১৯৫৪ সালেই দ্বিতীয়বার গ্রেফতার হয়ে অবরুদ্ধ থেকেছি ১৯৫৫ সাল পর্যন্ত। আবার ১৯৫৮ সালে আউব খানের সময় গ্রেফতার হই। পাঁচ বছর কয়েদ খেটেছি আর দু’বছর অন্তরীণ থেকেছি। মুখোমুখি হয়েছি বহু মামলার। আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা ওসবেরই একটি। ১৯৬৬ সালে আবার গ্রেফতার হই এবং তিন বছর অবরুদ্ধ থাকি। ইয়াহিয়া খান ক্ষমতায় এসে আবার গ্রেফতার করে। এরকম বহু কষ্ট ও দীর্ঘ সংগ্রামের মধ্য দিয়ে আমরা এ পর্যায়ে এসেছি। শুধু আমি নই আমার সহকর্মীরাও।
ফ্রস্ট : এরপর যখন শুনেছেন, নয় মাসের স্বাধীনতা যুদ্ধে আপনার কোনো কোনো সহকর্মী নিখোঁজ হয়েছে আপনার তখন কেমন লেগেছে?
শেখ মুজিব : আমার জীবনের সবচেয়ে খারাপ সময় ছিল ওটা যখন আমি শুনেছিলাম যে,.ওরা আমার ত্রিশ লাখ মানুষকে হত্যা করেছে।
ফ্রস্ট : (এ পর্যায়ে ফ্রস্ট কিছু ছবি তোলেন। ছবি তুলতে তুলতে বলেন) এই ছবিগুলো আমাদের স্মৃতি থেকে কখনোই মুছে যাবে না। আপনি জানেন এসব ছবি দুনিয়া জুড়ে ছড়িয়ে যাবে। ভবিষ্যতে যখন আপনি এসব ছবি দেখবেন...
গাজী সাইফুল ইসলাম

গাজী সাইফুল ইসলাম : ফ্রিল্যান্স প্রাবন্ধিক ও অনুবাদক
প্রকাশিত: মাসিক অগ্রপথিক, ইসলামিক ফাউন্ডেশন
বিশ্বের 100 ব্যক্তিত্বের মুখোমুখি

সোমবার, ৯ ডিসেম্বর, ২০১৯

‘Sunil Is Jealous Of Me, My Popularity’

My painful memories of being sexually exploited by Sunil rushed back when I heard he was criticising the ban on Nazrul Islam’s book.”

        Dola Mitra INTERVIEWS Taslima Nasreen                                                             15 October 2012                                                         Narendra Bisht


After Outlook’s interview with celebrated Bengali author Sunil Gangopadhyay (‘I am surprised and shocked by Taslima’s allegation,’ Sep 17) regarding fellow writer Taslima Nasreen’s explosive charge on Twitter that he sexually harassed her, the firebrand feminist wrote to us expressing her dismay that we, “like the other powerful patriarchal mainstream media”, had her “blacked out”. Subsequently, Dola Mitra spoke to her. Excerpts:

Why did you keep your allegation of a famous Bengali novelist sexually harassing you a secret all these years?
The sheer knowledge of what I was up against. I knew that the mainstream media and the powerful people with whom Sunil was associated, including Bengal’s biggest newspaper barons and the then state government, would not just black me out but also ensure I was harassed in every possible way.
Why now?
My painful memories of being sexually exploited by Sunil rushed back when I heard he was criticising the ban on Musalmander Koronio, a book by police officer Nazrul Islam (which slams the Bengal government for its tell-tale appeasement of Muslims). I never gave in to him, so he turned against me completely. He was instrumental in having my book Dwikhandita banned in 2003. Who is he to talk about freedom of speech? That’s why I tweeted about it at this stage.
It is said that you shared a consensual relationship with him and that you used him in order to gain entry into the literary circles of Calcutta.
I was well acquainted with the Calcutta literary circle since I was 17, when I lived in Bangladesh and published and edited a little magazine called Sejuti, for which young poets from both Bengals wrote. If you look at my life, there is no question of using anyone for anything. I have only got banned, blacklisted and banished.
As for a relationship, there was nothing between us, consensual or otherwise. Sunil is an elderly man, my father’s age. I respected him. But he betrayed my trust and made sexual advances towards me.... After I tweeted about being sexually harassed by Sunil, I received a deluge of e-mails in which others made similar complaints. In one, a father wrote about how his daughter was grabbed and kissed by him when she visited him. I know many girls who in order to have their poems and stories published put up with him but stay silent because they know their voices will be choked.
But in the interview to Outlook Sunil said you used to go to his house and you’d share meals together and he has photos of you sitting at his feet.
How many women, no matter how courageous, can say they cut off all relations with a man who made sexual advances towards her? I tried to forgive and forget. But he wanted to completely crush me. He tried to stifle my freedom of expression by having my book banned, using his connections in the state government and finally bundle me out of Calcutta.
Why would he want to do that to you? Because you shunned him?
I’ve been told Sunil is jealous of me. A publisher at the Calcutta Book Fair noticed I got 20 times more readers coming to me for autographs than him. I get invited to Western countries by governments, universities and organisations to deliver lectures on important issues like human rights and to attend different literary programmes as well as to receive prestigious awards. Sunil goes abroad primarily on invitations by immigrant Bengali communities, mainly Bangladeshis. He always resented my popularity. He was the only judge in the 10-judge Ananda Puroshkar committee who opposed my getting the prize twice, in 1992 and 2000. But despite this, I got the award twice. There are hundreds of documents about Sunil’s desperation to ban my book in 2003. In 2007, he secretly called me and told me to leave Calcutta.
It is said that your writing is derogatory towards Islam and deliberately inflammatory....
I write from my personal experience of being abused and exploited by a misogynist and patriarchal religious structure, which obviously does not suit the fundamentalist fanatics. It is unfair to label me anti-Islam. I am an atheist and a secular humanist.
Finally, it has been alleged that your tweets were politically motivated. That you are trying to curry favour with the Bengal government (Sunil has criticised the state government) so that you can return to Calcutta.
Don’t you think that I know that the TMC government will never risk the Muslim vote by bringing me back to Calcutta? I am a perpetual pariah as far as politicians are concerned because I speak the politically incorrect truth. Politicians only use me as a scapegoat to capture the Muslim vote.

সোমবার, ২৫ নভেম্বর, ২০১৯

Saddam Hussein's Poems অথবা সাদ্দাম হোসের কবিতা


ইরাকের সাবেক প্রেসিডেন্ট সাদ্দাম হোসেনের কবিতা
অনুবাদ: গাজী সাফু সলা
(30 ডিসেম্বর 2006 সাদ্দামকে ফাঁসিতে ঝোলায় আমেরিকার দোসর কুর্দী ইরাকিরা। আর লেখাটি দৈনিক জনকন্ঠে ছাপা হয়: 05 জানুয়ারি 2007)

সাদ্দাম হোসেনের কবি জীবন খুবই কম সময়ের। সব মিলিয়ে ৬৯ বছর বয়সের জীবনে দু’বছরেরও কম সময় কবিতা লিখেছেন তিনি। এই জীবনে একনায়ক, লৌহমানব এমনই আরও বহু নিষ্ঠুর অভিধায় বিভিন্ন সময় আখ্যায়িত করা হয়েছে তাঁকে। কিন্তু কবি নামে কেউ কখনো আখ্যায়িত করেছে বলে মনে হয় না। হয়তো তিনি নিজেও চান নি। কিন্তু জীবন-মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়িয়ে মহাকব্য লেখার ইচ্ছে প্রকাশ করেছিলেন তিনি। ইতিপূর্বে ঔপন্যাসিক হিসেবেও স্বীকৃতি মিলেছে তাঁর। গোটা তিনেক উপন্যাস (দি ফর্টিফাইড ক্যাসেল, ম্যান এন্ড দি সিটি ও বি গন ডেমনস) তাঁর জীবীতাবস্থাতেই প্রকাশিত হয়েছে। এসব সংবাদ আমরা জানতাম কিন্তু সাদ্দাম হোসেন যে কবিতা লিখতেন এটা আমাদের অনেকেরই অজানা ছিল। মার্কিন সেনাছাউনি ক্যাম্প ক্রপারে তাঁর জন্য নির্মিত ছয় ফুট বাই সাত ফুটের ঘরটিতে বন্দি থাকা অবস্থায় জানুয়ারি ২০০৪ থেকে ২০০৫ আগস্ট পর্যন্ত ১ বছর ৭ মাস সময় তিনি একটার পর কবিতা লিখে গেছেন। মাঝে মধ্যে কবিতা রেখে লিখেছেন গল্প। কিন্তু ওসব লেখা তিনি কাউকে দেখাতেন না। হয়তো দেখাবার মতো এমন নির্ভরযোগ্য মানুষ সেখানে তিনি পান নি। জীবনের শেষ দিনগুলোতে তিনি শুধু ঘৃণাই দেখেছেন তাঁর চারপাশে।

সাদ্দামের দেখাশোনা করার জন্য নিয়োজিত ৫৬ বছর বয়সী মার্কিন নার্স রবার্ট এলিস কিছুটা নরোম মনের মানুষ। দীর্ঘ সময় সাদ্দামের কাছাকাছি থেকে অন্যরকম এক সাদ্দামের দেখা পেয়েছিলেন তিনি। সাদ্দাম তখন শুধু বই পড়তেন। লিখতেন আর তাঁর খাবারের অংশ পাখিদের উদ্দেশ্যে ছুঁড়ে দিতেন। এলিসের ভাই মৃত্যুশয্যায় শুনে তিনি তাকে সাত্ত¡না দিয়ে বলেছিলেন, ‘‘ দুঃখ করো না। আমাকে মনে করো তোমার ভাই।’’ সাদ্দামকে ফাঁসি দেয়ার দু’দিন পর তিনি এসব কথা সাংবাদিকদের বলেছেন। স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে এলিস সাদ্দামের উঁচু আত্মসম্মান বোধের গল্প সাংবাদিকদের শুনিয়েছেন। দরজার নিচের একটি ফুটো দিয়ে প্রথম প্রথম ওরা তাঁকে খাবার দিতো। হিংস্র জানোয়ারকে যেভাবে খাবার দেয়া হয়। সাদ্দাম এ অপমান সহ্য করতে না পেরে এর প্রাতিবাদে খাদ্য গ্রহণ করতেই অস্বীকৃতি জানালেন। শেষে দুয়ার খুলে স্বাভাবিকভাবেই খাবার দিতে বাধ্য হয়েছিল তারা।
এলিস জানিয়েছেন, এত অপমান, কষ্ট সত্তে¡ও সাদ্দামকে কখনো অনুশোচনা করতে দেখেন নি তিনি। একটা কথাই সাদ্দাম বলতেন, যা কিছু করেছি-ইরাকের ভালোর জন্য করেছি। এলিসের সঙ্গে গল্পছলে অতীতের স্মৃতিচারণও করতেন সাদ্দাম। তিনি যে কৃষক ছিলেন এ কথা তিনি মনে রেখেছিলেন। তিনি তাঁর বাল্যে স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে তাঁর বাড়ির কথা, ছেলেমেয়েদের কথা বলেছেন।
 তবে ধারণা করা হয় সাদ্দামের অনেক কবিতা, গল্প এলিসের কাছে থাকতে পারে। কিন্তু এলিস সামরিক আইন লঙ্ঘন হয়ে যায় এই ভয়ে ওসব কথা প্রকাশ করছেন না। একদিন হয়তো সবকিছু জানা যাবে।
অবশ্য আগেও একবার সানডে টাইমসের একটি রিপোর্ট থেকে আমরা জানতে পেরেছিলাম সাদ্দাম যে কবিতা লিখতে শুরু করেছিলেন। নিচের সানডে টাইমস-এর রিপোর্টের সংক্ষিপ্ত অনুবাদ  প্রকাশ করার হলো।
আমি মরার জন্য প্রস্তুত আছি
(লন্ডনের সানডে টাইমস পত্রিকার বরাদ দিয়ে ইন্দো-এশিয়ান নিউজ সার্ভিস সংবাদটি পরিবেশন করেছিল ১৪ মে, ২০০৬।)
সাবেক ইরাকি প্রেসিডেন্ট সাদ্দাম হোসেন তাঁর বিশ্বস্ত আইনজীবী বুশরা খলিলকে, যখন তিনি কয়েদখানায় তাঁর সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে গিয়েছিলেন,  বলেছিলেন, “আমি মরার জন্য প্রস্তুত আছি।”
“আই এম র‌্যাডি টু ডাই।” সাদ্দাম হোসেনের উদ্ধৃতি দিয়ে ব্রিটিশ পত্রিকাটি লিখেছে, তিনি বলেছিলেন, “ফাঁসির ভয়ে ভীত নই আমি।”
মিসেস খলিল লেবানিজ আইনজীবী, যিনি একমাত্র মহিলা সাদ্দামের সঙ্গে দেখা করার অনুমতি পেয়েছিলেন। ওই তারিখে সাদ্দামের সঙ্গে পাঁচ ঘণ্টা ধরে কথা বলেছিলেন মিসেস খলিল, তবে বেশিরভাগ সময় কথা হয়েছে বিশ্বরাজনীতি আর একটি ছোট্ট কবিতা নিয়ে। তিনি তাকে জোর দিয়ে বলেছিলেন, মৃত্যুর কথা ভেবে তিনি কখনো আতঙ্কিত হন না, তিনি তাঁর ভাগ্যকে মেনে নিয়েছেন। তিনি স্মৃতি চারণ করতে গিয়ে বলেছিলেন, আমি তো সেদিন-ই মরে যেতে পারতাম যে দিন আব্দুল করিম কাজিম আমাকে হত্যা করতে চেয়েছিল।” ওই ঘটনার পর পরই  আব্দুল করিমকে দেশান্তরিত করা হয়। সেটা ১৯৫৯ সালের কথা। নির্বাসন নয়, ইরাকে সর্বোচ্চ দ  ফাঁসি।
মিসেস খলিল জানিয়েছিলেন, সাদ্দামকে সুস্থ আর স্বাভাবিক মনে হচ্ছিল। তিনি নিজের বিচারের চেয়ে আন্তর্জাতিক রাজনীতি আর কবিতা নিয়েই আলাপ করতে বেশি আগ্রহী ছিলেন। কিন্তু এক পর্যায়ে সাবেক প্রেসিডেণ্ট চিন্তিতভাবে বলেছিলেন, “ইরাকে আমেরিকার আগ্রাসনে ইরানের সেনাববাহিনীর উচ্চাকাঙ্খা বেড়ে  যেতে পারে।” মিসেস খলিল বলেছিলেন, ওটা ছিল আমাদের দ্বিতীয় সাক্ষাৎকার। বিভিন্ন বিষয়ে আমাদের মধ্যে কথা হয়েছিল। বিচার কার্য, আন্তর্জাতিক বিষয়াবলি এবং কবিতা। আমি তাঁকে একটি বই দিয়েছিলাম, কবি আল-মুতানব্বির (যাঁকে আরবি ভাষার সবচেয়ে বড় কবি মনে করা হয়) কবিতার বই। বইটি পেয়ে তিনি খুব খুশি হয়েছিলেন। তিনি বইটা এমনভাবে গ্রহণ করেছিলেন যে, মনে হয়েছিল, তিনি যেন ওটাই চাইছিলেন। ওই সাক্ষাৎকারে সাদ্দাম তাঁকে তাঁর নতুন মহাকাব্য সম্পর্কে বলেছিলেন। মিসেস খলিল জানিয়েছিলেন, ওইদিন মি. সাদ্দাম তাকে বলেছিলেন, “আগে আমি কবিতা লেখার সময় পাইনি, কিন্তু এখন আমার অনেক সময়, নিজেকে আমি কবি করে তুলতে পারব।”
দি গার্ডিয়ান-এর রিপোর্ট
সাদ্দাম হোসেন যে কবিতা লিখতে শুরু করেছিলেন ওটা সম্ভবত প্রথমবার বিশ্ব জানতে পারে ২০০৪ সালের মে মাসে। মার্কিনীদের তথ্যাবধানে নব গঠিত ইরাক সরকার কর্তৃক নিয়োজিত মানবাধিকার মন্ত্রি বখতিয়ার আমিনের বরাদ দিয়ে লন্ডনের দি গার্ডিয়ান পত্রিকা তখন ওই সংবাদটি ছেপেছিল। নির্জন কয়েদখানায় অন্তরীণ অবস্থায় সাদ্দাম সময় কাটাচ্ছিলেন কুরান পড়ে আর কবিতা লিখে। ওই সময় তিনি ১৯৯১ সালে উপসাগরীয় যুদ্ধ থেকে সৃষ্ট শত্রট্ট জর্জ বুশকে নিয়ে একটি কবিতা লিখেছিলেন। সাদ্দামের সঙ্গে কয়েদখাানয় দেখা করতে গিয়ে বখতিয়ার আমিন তা আবিস্কার করেছিলেন। বখতিয়ার আমিন খুবই সংক্ষিপ্ত পরিসরে সাদ্দামের কবিতা সম্পর্কে রিপোর্ট করেছিলেন। তিনি বলেছিলেন, “ সাদ্দামের একটি কবিতা জর্জ  বুশকে নিয়ে কিন্তু ওটি পড়ার সময় আমার নেই।” অবশ্য দি গার্ডিয়ানও নিশ্চিত হতে পারে নি কবিতাটি বর্তমানে ক্ষমতাসীন প্রেসিডেণ্ট জর্জ ডবিøউ. বুশকে নিয়ে নাকি তার বাবা জর্জ বুশকে নিয়ে। যাহোক, বুশকে নিয়ে লিখা কবিতাটির অনুবাদ এখানে তুলে ধরা হলো।

আমার কলমই  গোপন অস্ত্র আমার

তারা আমাকে বলল বাগদাদের জানোয়ার
তাদের আচরণ বেদনাদায়ক আর বিদ্রুপপূর্ণ
কারণ তারা জানে না কখনো দেখেনি
সুরেলা মধুর কবিতার জগৎ আমার।
নিশ্চয়ই, আমি অনুমতি দিয়েছিলাম কিছুলোককে চাবুক মারার জন্য
এবং কিছু দম্ভোক্তিও করেছিলাম শত্রট্টকে হত্যা করার জন্য
কিন্তু এখন আমি আশা করছি পৃথিবীকে নতুন কিছু দেখানোর
এই সাদ্দামের এমন কিছু গুণ আছে যা কেউ জানে না।
এই সাদ্দামের দেহ-মন পূর্ণ শারীরিক-মানসিক যন্ত্রণায়
তবু সে চায় ঝাড়– দিয়ে দূর দিতে মানুষের বেদনা...প্রকৃতপক্ষে,
তাঁর নিজেরই নাম শুরু হয়েছে ‘স্যাড’ দিয়ে।
তুমি ধরে নিয়েছ কিছু অস্ত্র লুকিয়ে রেখেছি আমি
হ্যাঁ, আমি তা স্বীকার করছি একটা অস্ত্র রয়েছে লুকোনো
এবং তা হলো আমার কলম, এটির মাথায় রয়েছে বিষ্ফোরক
অতীব শীতল হৃদয় গরম করার জন্য ।
এটা না কারাগার না পূতিগন্ধময় ইঁদুরের গর্ত
এখনও এটা শোক আর আর্তনাদে পূর্ণ।
তাই আমি এখন আবেগ পুড়াব, পরিভ্রমণ করব ভাবের জগতে
যতদিন না তুমি জেলের বাইরে নেবে আমাকে।
(এ কবিতাটির সম্ভাব্য ইংরেজি অনুবাদক- Gene Weingarten)

বাগদাদের বাঙ্কারে বসে আমি দেখছি আমার আকাশ

একটি দলার মতো পড়ে আছি বাঙ্কারে
কখনো শুনছি ক্যাবলে শেষ সংবাদটি
কখনো স্ত্রীদের সঙ্গে কাটছে সময়
এবং কেবলই ভেবে যাচ্ছি কী করব
আলাপ করছি উদে আর কুসের সঙ্গে
একটি স্মার্ট বোমার বিস্ফোরণ ঘটল
 মাথার ওপর
ভাবতে শুরু করলাম কিছু লোক আমাকে
ভালোবাসে না
আমি জেনে গেছি যে
আমার জীবনের দিন গুনা শুরু হয়ে গেছে।
অনুমান করছি নিজেকে একা আর দুঃখিত লাগছে
এমনসব কাজ করতে মন চাইছে, যা আগে চায়নি
 ছবি আঁকতে আর টাট্টু ঘোড়ায় চড়ে বেড়াতে
একটি দলার মতো পড়ে আছি বাঙ্কারে
দেখছি শেষ ক্যাবল সংবাদটি
অস্বস্তি হচ্ছ-মনও খুব ভেঙে পড়ছে
বাগদাদের বাঙ্কারে বসে আমি দেখছি আমার আকাশ।
বি.দ্র. যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর বাগদাদ থেকে তিকরিতে পলায়নের আগ পর্যন্ত সাদ্দাম বাগদাদের একটি ব্যাঙ্কারে তার পরিবার পরিজনদের নিয়ে কিছুদিন ছিলেন। ওই বাঙ্কারে বসেই তিনি এ কবিতাটি লিখেছিলেন। একটি লিটার‌্যারি ব্লগ থেকে পাওয়া গেছে এই কবিতাটি। এই কবিতাটিতেই ইঙ্গিত রয়েছে, সাদ্দাম যে বুঝতে পেরেছিলেন একদিন তাঁকে মেরে ফেলা হবে। আর তিনি যে কবিতা লিখতে চান, চবি আঁকতে চান।

একে (সম্ভবত ইরাক) মুক্ত করে দাও

একে মুক্ত করে দাও
আর মুক্ত করো তোমার মন।
এ যে আমার আত্মার সঙ্গী আর তুমি তো আমার আত্মার প্রিয়তম।
আমার যে হৃদয়টা তুমি পেয়েছ - কোনো ঘর তাকে আশ্রয় দিতে পারত না
যদি আমি ওইঘরে থাকতাম - তুমি হতে তার শিশির
তুমি তো ঘুরে ঘুরে ফিরে আসা মৃদুমন্দ বাতাস
আত্মা আমার পবিত্র হয় তোমার ছোঁয়ায়
এবং আমাদের বাথ পার্টি সবুজে শোভিত একটি ডালের মতো বিকশিত হয়।
কোনো ওষুধ এ রোগ আরোগ্য করবে না কিন্তু একটি গোলাপ তা সেরে দেবে।
শত্রট্টরা পরিকল্পনা করছে আর পাতছে ফাঁদ
সকলেই তারা নিজেদের ভুল জেনেও ছড়িয়ে দিচ্ছে প্রচ  ঘৃণা।
অন্যায্য দাবি প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনা এটি এবং তা শূন্যতায় ভরা
কিছুই প্রমাণ করবে না তা পরাজয় ছাড়া
মরিচা পড়া লোহার মতো তাদের দর্প আমরা চূর্ণ করে দেব
এরপর পাপের অতল গহব্বরে তলিয়ে যাবে তারা।
একে মুক্ত করে দাও
আমরা কখনো দুর্বল হবো না
আমাদের নৈতিকতা দ্বারা প্রতিষ্ঠিত আমাদের দৃঢ়তা।
সম্মানীয় আমাদের প্রতিরোধ, আমাদের আত্মার সঙ্গী
শত্রট্টদের তাড়িয়ে নিয়ে ফেলবে আমাদের সাগরে
এবং যারা তাদের সহযোগীতা করবে কাঁদতে হবে তাদেরও।
এখানে আমরা বুক খুলে দাঁড়িয়েছি নেংড়েদের  উদ্দেশ্যে
এবং কখনোই নতজানু হবো না ওসব পশুদের সামনে।
আমরা যুদ্ধ করব সবচেয়ে কঠিন চ্যালেঞ্জের সঙ্গে
এবং তাদের পশ্চাৎদেশে লাগাব চাবুক- খোদার ইচ্ছায়।
কীভাবে টিকবে তারা এমন চাপের মুখে?
বন্ধুরা, আমরা কখনো তোমাদের পড়তে দেব না ধূলোয়
সকল দুর্যোগে, আমাদের দল এবং দলের নেতা।
আমি আমার আত্মা উৎসর্গ করব এবং আমাদের জাতি
কঠিন সময়ে সহজেই পারে রক্ত ঝরাতে
শত্রট্টর যে কোনো আক্রমণে পা কাঁপবে না আমাদের
আবার শত্রুদের সঙ্গে আমরা আচরণও করি সম্মানের সাথে...


বি.দ্র. ইরাকের সাবেক প্রেসিডেন্ট সাদ্দাম হোসেনের জীবনের শেষ কবিতার নাম Unbind it (ইংরেজি অনুবাদ), কখন, কী অবস্থায় তিনি এটি লিখেছিলেন হয়তো কোনোদিন জানা যাবে না। সম্ভবত তাঁর কোনো কবিতাতেই স্থান-কালের উল্লেখ নেই। সাদ্দামের চাচাত ভাই মুয়িদ ধামিন আল-হাজ্জ টেলিফোনে কবিতাটি পড়ে সাংবাদিকদের শোনান। নিউ ইয়র্ক টাইমসের অনুবাদে কবিতাটির একাংশ ওই পত্রিকায় ছাপা হয় ৪ জানুয়ারি, ২০০৭।